Thursday, February 6, 2014
এন্ডোমেট্রিওসিস : মহিলাদের রোগ
এন্ডোমেট্রিওসিস মোটামুটি পরিচিত এক সমস্যা। অনেক মহিলা এই সমস্যায় খুব কষ্ট পায়। আমাদের দেশের বেশীরভাগ মহিলা চাপা স্বভাবের। ছোটখাট সমস্যা হলে কাউকে বলতে চায়না। এমনকি স্বামীকেও বলতে দ্বিধা বোধ করে। কিন্তু এন্ডোমেট্রিওসিস হলে তলপেটে এত অসহ্য ব্যথা হয় যে কাউকে না বলে পারা যায়না। এ অসুখ হলে মাসিকের সময় মহিলাদের প্রচন্ড কষ্ট হয়।
মহিলাদের ইউটেরাস বা জরায়ুতে তিনটি স্তর থাকে। সবচেয়ে ভেতরের স্তরের নাম এন্ডোমেট্রিয়াল। এই এন্ডোমেট্রিয়াল কোষ যখন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে জরায়ুর বাইরে অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে এন্ডোমেট্রিওসিস বলে। সাধারণত:ওভারি, ফেলোপিয়ান টিউব, পেটের মধ্যে, স্কার টিস্যুতে এই এন্ডোমেট্রিয়াল কোষগুলো ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণত: যেসব মহিলারা সন্তান জন্ম দেয়ার বয়সের মধ্যে (অর্থাৎ ১৮ থেকে ৪৫ বছর) পড়েন তাদের এন্ডোমেট্রিওসিস দেখা যায়।
এই রোগের লক্ষণসমূহ : অনিয়মিত মাসিক, মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা অনেক সময় এত ব্যথা হয় যে রোগী চিৎকার করতে থাকে এবং সহবাসের সময়ও ব্যথা হয়, মলমূত্র ত্যাগ করার সময় ব্যথা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যাত্ব, প্রস্রাবের সাথে রক্ত পড়া ইত্যাদি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা : শুধু লক্ষণ শুনে এবং শারীরিক পরীক্ষা করে নিশ্চিতভাবে রোগটি ডায়াগনসিস সম্ভব নয়। আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলে রোগটি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে শতভাগ নিশ্চিত হবার জন্য ল্যাপারোস্কোপি করে বায়োপসির মাধ্যমে রোগটি ধরা যায়।
চিকিৎসা : এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা হয় অপারেশন বা ওষুধের মাধ্যমে। পেটের ব্যথা কমানোর জন্য ঘঝঅওউং ব্যবহার করা হয়। গোনাডোট্রপিন এনালগ ব্যবহার করে ভাল ফল পাওয়া গেছে।
এছাড়া ঙঈচ এবং প্রজেস্টিনের সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়। ওষুধে কাজ না হলে সার্জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এন্ডোমেট্রিওসিস যেহেতু বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী তাই যাদের এন্ডোমেট্রিওসিসের সমস্যা আছে তাদের তাড়াতাড়ি বাচ্চা নেওয়া উচিত।
ম ডাঃ মোঃ ফজলুল কবির পাভেল
প্রভাষক, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ পাবনা মেডিকেল কলেজ, পাবনা
লিভার সিরোসিস ক্যান্সার নয়
লিভার সিরোসিস-আঁৎকে ওঠার মতো একটি রোগের নাম। সিরোসিস শুনলেই যেন মনে আসে আরেকটি আরো ভয়াবহ রোগের নাম ‘লিভার ক্যান্সার’। সিরোসিস আর ক্যান্সার সাধারণ মানুষের কাছে একে অপরের সমার্থক। অথচ ব্যাপারটি কিন্তু ঠিক তা নয়।
সিরোসিস কী?
সিরোসিস লিভারের একটি ক্রনিক রোগ, যাতে লিভারের সাধারণ আর্কিটেকচার নষ্ট হয়ে যায়। ফলে লিভার হারায় তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। অনেক ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিস থেকে লিভারে ক্যান্সারও দেখা দিতে পারে। তবে এসব কোনো কিছুই হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকের মতো সহসা ঘটে না। সিরোসিস আক্রান্ত রোগী বহু বছর পর্যন্ত কোনোরকম রোগের লক্ষণ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম-ধরা যাক, আমাদের লিভারটা একটা আধুনিক এপার্টমেন্ট, যাতে সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধাই বিদ্যমান। এই এপার্টমেন্টের একটি কল নষ্ট থাকতে পারে কিংবা নষ্ট থাকতে পারে পুরো পানির সাপ্লাই লাইন অথবা আরো বেশি কিছু। ঠিক একইভাবে সিরোসিসেও লিভারে সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে কিংবা সমস্যাটি হতে পারে অনেক বড় কিছু। একটা পানির কল নষ্ট হলে যেমন এপার্টমেন্টের অধিবাসীদের কোনো সমস্যা হয় না, তেমনি কম্পেনসেটেড বা আর্লি সিরোসিসেও রোগাক্রান্ত ব্যক্তির কোনো অসুবিধা হয় না বললেই চলে। রোগের লক্ষণ আর কষ্টগুলো দেখা দেয় ডিকম্পেনসেটেড বা এডভান্সড সিরোসিসে যখন ওই এপার্টমেন্টটির নষ্ট পানি সরবরাহ লাইনটির মতো লিভারেও বড় ধরনের গোলযোগ দেখা দেয়।
সিরোসিসের লক্ষণ কী?
আগেই বলেছি, কম্পেনসেটেড সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না বললেই চলে। অনেক সময় রোগীরা দুর্বলতা, সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, দাঁতের মাড়ি বা নাক থেকে রক্ত পড়া, পেটের ডান পাশে ব্যথা, জ্বর-জ্বর ভাব, ঘন-ঘন পেট খারাপ হওয়া ইত্যাদি সমস্যা অনুভব করতে পারেন।
এডভান্সড সিরোসিসে চিত্রটি কিন্তু একদম বদলে যায়। এ সময় পায়ে-পেটে পানি আসে, জন্ডিস হয় এবং রোগী এমনকি অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন। রক্তবমি ও পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ফুসফুসে পানি আসা, কিডনি ফেইলিওর, শরীরের যে কোনো জায়গা থেকে আনকন্ট্রোলড ব্লিডিং ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে যা ভয়াবহ তা হলো, লিভারে দেখা দিতে পারে ক্যান্সার।
সিরোসিস কেন হয়?
এই তালিকাটি অনেক বড় এবং দেশভেদে সিরোসিসের কারণগুলোও ভিন্ন। ইউরোপ ও আমেরিকায় সিরোসিসের প্রধান কারণ এলকোহল আর হেপাটাইটিস সি ভাইরাস। বাংলাদেশে প্রায় আড়াই হাজার রোগীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, এদেশে লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, আর এর ঠিক পরেই রয়েছে ফ্যাটি লিভার। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ও এলকোহলের স্থান বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও ফ্যাটি লিভারের অনেক পরে।
ফ্যাটি লিভার নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস, ডিজলিপিডেমিয়া (রক্তে চর্বি বেশি থাকা), ওবেসিটি (মেদ-ভুঁড়ি), উচ্চ রক্তচাপ আর হাইপোথাইরয়ডিজম ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণ। পাশ্চাত্যে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী পরে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন। এদেশেও ফ্যাটি লিভারজনিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যাসারের রোগী পাওয়া যায়। অতএব সাবধান!
সিরোসিস হলে কী করবেন?
সিরোসিসে আক্রান্ত যে কোনো ব্যক্তির উচিত দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নেয়া ও নিয়মিত ফলোআপে থাকা। এতে দীর্ঘদিন ভালো থাকা যায়। পাশাপাশি সিরোসিসের কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা গেলে লিভার খারাপের দিকে যাওয়ার ঝুঁকিও অনেক কমে যায়। লিভার সিরোসিস ও এর কারণগুলোর আধুনিকতম চিকিৎসা এখন এদেশেই সম্ভব। দেশেই তৈরি হচ্ছে অধিকাংশ ওষুধ। এদেশে যা নেই, তা হলো লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের ব্যবস্থা। প্রতিবেশী দু-একটি দেশে এ সুযোগ থাকলেও তা খুবই ব্যয়বহুল আর সঙ্গত কারণেই এদেশের সিংহভাগ রোগীর সাধ্যের অতীত। তবে আশার কথা এই যে, এদেশে রয়েছেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ও হেপাটোলজিস্ট এবং উদ্যমী বেসরকারি হাসপাতাল। সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যেদিন ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালেই অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে এদেশে প্রথম লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সম্ভব হবে।
শেষ কথা
লিভার সিরোসিসে শেষ কথা বলে কিছু নেই। প্রয়োজন প্রাথমিক পর্যায়ে সিরোসিসের রোগীকে শনাক্ত করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। যেহেতু আর্লি সিরোসিসে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না বললেই চলে, তাই রোগী আর চিকিৎসক উভয়ের সচেতনতা এক্ষেত্রে খুবই জরুরি।
ম ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল)
সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, লিভার, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ ইন্টারভেনশনাল এন্ডোস্কোপিস্ট ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হসপিটাল
মূত্রথলির ক্যান্সার
মূত্রথলি মানুষের তলপেটে অবস্থিত মূত্র সংগ্রহের আধার। এটি সাধারণত পিউবিক বোনের পিছনে থাকে তবে পরিপূর্ণ অবস্থায় তলপেটে চলে আসে। দু’টি কিডনি থেকে দু’টি নালীর মাধ্যমে প্রস্রাব মূত্রথলিতে জমা হয়। যখন মূত্রথলি প্রস্রাবে পরিপূর্ণ হয় তখন এর সংকোচন শুরু হয়। প্রস্রাব নালীর মাধ্যমে মূত্র শরীরের বাহিরে পরিত্যাক্ত হয়। প্রস্রাবের থলির ভিতরের দিকে একধরনের বিশেষ কোষের ঝিল্লি থাকে। এটাকে বলা হয় ট্রানজিসনাল সেল। এই সেলের বিশেষত্ব হলো এখান থেকে পুনরায় মূত্র শোষণ হয় না এবং প্রসারিত হতে পারে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মত মূত্রথলিতে ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে। মূত্রথলির ক্যান্সার এর মিউকাস মেমব্রেন বা ঝিল্লি থেকে উৎপন্ন হয়। তাই এটাকে বলা হয় ট্রানজিসনাল সেল ক্যান্সার। মূত্র ও জননতন্ত্রের ক্যান্সারের মধ্যে মূত্রথলির ক্যান্সার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
এই রোগ মহিলাদের থেকে পুরুষদের মধ্যে বেশী দেখা যায়। এই রোগ অতিরিক্ত ধূমপায়ী, যারা রং, কীটনাশক কিংবা রাসায়নিক দ্রব্য নাড়াচাড়া করেন, নিয়মিত বেদনানাশক ওষুধ সেবন করেন, অতিরিক্ত কফি পান করেন কিংবা ওজন কমানোর জন্য চাইনিজ টি গ্রহণকারীদের মধ্যে বেশী দেখা যায়। এছাড়াও মূত্রথলির পাথর দীর্ঘদিন বিনা চিকিত্সায় থাকলে বা ঘনঘন সংক্রমণ প্রভৃতিকে এই রোগের কারণ হিসেবে মনে করা হয়। অ-ধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের মধ্যে মূত্রথলির ক্যান্সার ৪ গুণ বেশী। ধূমপায়ীদের মধ্যে ঝুঁকি নির্ভর করে দিনে কতগুলো সিগারেট খাচ্ছেন, কতক্ষণ খাচ্ছেন এবং কি পরিমাণ সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসে টেনে নিচ্ছেন তার উপর। সিগারেটের ধোঁয়া রক্তের সংস্পর্শে আসার পর তা থেকে নাইট্রোসএমাইন, ২- ন্যাপথালমাইন ও ৪-এমাইনো বাই ফেনাইল রক্তের সাথে মিশে যায় যা মূত্রথলির ক্যান্সার হওয়ার পিছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বেদনানাশক ফেনসিটিন উপাদানের সাথে এনিলিন ডাইর রাসায়নিক গঠনগত সাদৃশ্য রয়েছে। এই এনিলিন ডাই মূত্রথলির ক্যান্সারের জন্য র্ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য। এছাড়াও মূত্রথলির ক্রনিক সংক্রমণ, দীর্ঘদিন মূত্রথলিতে পাথর থাকলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মূত্রথলির ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণ প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে আসেন। প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া উপসর্গকে হিমাচুরিয়া বলে।
এক্ষেত্রে হিমাচুরিয়ার সাথে ব্যথা থাকে না এবং মাঝে মাঝে প্রস্রাবের সাথে ব্যথাবিহীন রক্ত যেতে দেখা যায়। আরও যে সমস্ত উপসর্গ আছে তা হলো ঘনঘন প্রস্রাব করা, প্রস্রাব ধরে রাখতে অসুবিধা হওয়া, প্রস্রাবে জ্বালাযন্ত্রণা করা, কোমরে ব্যথা ইত্যাদি। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রস্রাবে রক্ত কণিকা ও পাস সেল পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে মূত্রথলি বা নালিতে সংক্রমণ আছে কিনা তা কালচার সেনসিটিভিটি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়। আলট্রাসনোগ্রাম করে মূত্রথলিতে কোন টিউমার থাকলে তা দেখা যায। ক্যান্সারটি বহুকেন্দ্রিক হতে পারে। তাই মূত্রথলিতে পাওয়া গেলে মূত্রতন্ত্রের অন্য কোথাও আছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়। মূত্রথলির ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগটি কোন পর্যায়ে আছে তার উপর।
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি ধরা পড়লে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে টিউমারটি কেটে ফেলে টিউমারটি যাতে আবার দেখা না দেয় তার জন্য মূত্রথলিতে কেমোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়। রোগটি যদি ব্লাডারের মাংসপেশী পর্যন্ত ছড়ায় তা হলে সম্পূর্ণ মূত্রথলি কেটে বাদ দিয়ে পরিপাকতন্ত্রের একটি অংশ নিয়ে মূত্রথলি বানিয়ে দেয়া হয়। রোগটি যদি শরীরে ছড়িয়ে যায় তবে সিসটেমিক কেমোথেরাপির সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়।
আমাদের দেশের ইউরোলজিষ্টরা অত্যন্ত সাফল্যজনকভাবে মূত্রাধার বানানোসহ সাফল্যজনকভাবে এই রোগের চিকিত্সা করছেন।
ম ডাঃ মুহাম্মদ হোসেন
সহযোগী অধ্যাপক, ইউরোলজি বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। চেম্বার:ঢাকা রেনাল এন্ড জেনারেল হাসপাতাল, ১৬১/এ, লেক সার্কাস, কলাবাগান, ঢাকা
ক্লান্তি : অনেক রোগের উপসর্গ
ক্লান্তির একটি বড় কারণ হলো অনিদ্রা। ঘুম খুব কম হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মনোযোগ ও স্বাস্থ্যের উপর। পূর্ণবয়ষ্কদের প্রতিরাতে ঘুম হওয়া উচিত ৭-৮ ঘন্টা। ঘুম হওয়া উচিত বড় রকমের অগ্রাধিকার। ঘুমের একটি নিয়মিত সূচী থাকাও চাই। ঘুম ঘরে যেন না থাকে ল্যপটপ, সেলফোন ও টিভি। এরপরও সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ। ঘুমের বৈকল্য থাকতেও পারে। নিম্নে ক্লান্তির কারণগুলো হলো :
স্লিপ এপনিয়া হতে পারে বড় কারণ অনেকে মনে করেন বেশ ঘুম হচ্ছে, নাক ডাকিয়ে ঘুম। কিন্তু ঘুমে সাময়িক শ্বাসবোধ বা এপনিয়া তো পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সারারাত ধরে মাঝে মধ্যে এমন স্বপ্নকালের শ্বাসবিরতি। প্রতি বিরতিতে সামান্য ক্ষণের জন্য হলেও জেগে উঠা হয়ত অজান্তেই। ফলাফল হলো: আট ঘন্টা হলেও ঘুমের ঘাটতি থেকে গেলো। হা করে ঘুমানো খুব বাজে অভ্যাস। স্থূল হলে ওজন হ্রাস করা চাই। ধূমপান করে থাকলে বর্জন করুন। সিপিএপি ডিভাইস ব্যবহার করা যাতে রাতে নিদ্রাকালে শ্বাসপথ থাকে উম্মুক্ত।
খুব কম আহার করা
ক্লান্তির অন্যতম কারণ শরীরে পর্যাপ্ত জ্বালানির জোগান নেই। খুব কম আহার করলে ক্লান্তি আসে। আবার ভুল খাবার খেলেও সমস্যা হয়। সুষম খাদ্য খেলে রক্তের সুগার মানকে স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখে, আর রক্তের সুগার নেমে গেলে যে শ্লথ গতি হয় শরীর একেও রোধ করে। প্রাত:রাশ খাওয়া কখনও বাদ দেবেননা, প্রতিবেলার আহারে যেন অবশ্য থাকে জটিল শর্করা ও প্রোটিন। যেমন গমের টোস্ট ও ডিম। দিনভর স্থির এনার্জির জন্য কম করে সারাদিন খাওয়া।
ক্লান্তির কারণ রক্তস্বল্পতা
নারীদের ক্লান্তির একটি কারণ হলো রক্তস্বল্পতা। ঋতুস্রাবের সময় অধিক রক্তক্ষয় হলো লৌহ ঘাটতি। মেয়েরা তাই থাকে ঝুঁকিতে। প্রয়োজন লোহিত কনিকা। কারণ এর অক্সিজেন বহন করে টিস্যুও দেহযন্ত্রে। লৌহ ঘাটতি হয়ে রক্তস্বল্পতা হলে লৌহ পরিপূরক ওষুধ, লৌহসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, কৃশমাংস, যকৃত্, শেলফিস, ধানস, লৌহসমৃদ্ধ শস্য। কচু শাক, লালশাখ, তেল দিয়ে ভেজে খেলে ভালো।
ক্লান্ত ও বিষন্নতা যদি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ জরুরী।
ক্লান্তির কারণ হতে পারে হাইপোথাইরয়েডিজম
গলদেশের মূলে রয়েছ ছোট গ্রন্থি থাইরয়েড। আমাদের দেহবিপাক নিয়ন্ত্রণ করে। শরীরের জ্বালানিকে গতিতে ও এনার্জিতে রূপান্তরিত করে। এর গতিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রন্থির কাজ কর্ম শ্লথ হলে, বিপাক চলে মন্দগতিতে। শরীরও তখন স্লথ হয়ে যায়। রক্ষ পরীক্ষায় যদি প্রমাণ হয় যে থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ-কর্ম মন্থরগতি তাহলে প্রয়োজন হতে পারে সিনথেটিক হরমোন তখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরী।
ক্যাফিন ওভারলোডে হতে পারে ক্লান্তি
ক্যাফিন মাঝারি মাত্রায় সজাগ সতর্ক করে মান। কিন্তু খুব বেশি হলে বাড়ে হূদঘাত হার। রক্তচাপ ও বাড়ায়। শরীর ও মনকে ক্লান্ত করে।
মূত্র সংক্রমণেও হতে পারে ক্লান্তি মূত্রসংক্রমণ যাদের হয় তাদের প্রস্রাবে হয় জ্বালা ও বারবার প্রস্রাব করার তাগিদ। তবে সংক্রমণ সব সময় জোরালো উপসর্গ নিয়ে আসেনা। একমাত্র লক্ষণ হতে পারে ক্লান্তি। মূত্র পরীক্ষা করলে মূত্র সংক্রমণ ধরা পড়ে। এন্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসায় ক্লান্তিও ভালো হয়।
ডায়াবেটিসও হতে পারে ক্লান্তির কারণ
ডায়াবেটিস হলে রক্তে বাড়ে সুগার। দেহকোষে না ঢুকে সেই সুগার ক্রমাগত বাড়তে থাকে রক্তে। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় হরমোন ইনসুলিনের সহায়তায় সুগার দেহকোষে ঢুকে শক্তিতে রূপান্তরিত হবার কথা। কিন্তু ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিনের হয় ঘাটতি। ফলাফল; এত খাওয়ার পরও শরীর হয়ে পড়ে দুর্বল ও নি:শক্তি। তাই ক্লান্তি যদি অটল হয়ে থাকে তাহলে ডায়াবেটিসের জন্য রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। ডায়াবেটিসের চিকিৎসার মধ্যে জীবন যাপনে পরিবর্তন আনা; খাদ্যবিধি ও ব্যায়াম করা। প্রয়োজনে মুখে খাবার ওষুধ ও ইনসুলিন।
পানিশূন্যতাও হতে পারে ক্লান্তির কারণ
ক্লান্তির একটি বড় কারণ পানিশূন্যতা। ব্যায়াম করুন বা ডেক্সে কাজ করুন, শরীরে পানি চাই, শরীর শীতল থাকা চাই। পিপাসা পেলে বোঝা গেলো পানির প্রয়োজন শরীরের। সারাদিন পানি পান করুন, তাহলে লঘু মূত্র হবে, হালকা লাগবে। শরীর চর্চার আধঘন্টা/এক ঘন্টা আগে পানি পান করুন দুগ্লাস।
হৃদরোগেও হতে পারে ক্লান্তি
প্রতিদিনের কাজ কর্মে ক্লান্তি ভর করলে যেমন বাগান পরিষ্কার করা বা ঘর পরিষ্কার করা তখন বুঝতে হবে হয়ত হৃদযন্ত্র আর এত সবল নয়। যদি দেখা যায় যে কাজগুলো এক সময় সহজ মনে হতো সেগুলো এখন কঠিন মনে হচ্ছে, তাহলে হৃদচিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া ভালো। যদি হৃদরোগ হয়ও তাহলে জীবন ধারার পরিবর্তন, ওষুধ, চিকিৎসা কুশলে রাখতে চেষ্টা করবে। শক্তি ফিরিয়ে আনতে হবে শরীরে।
সিফট্ কাজে ঘুমের সমস্যা
রাতভর কাজ বা নাইট শিফট্ দেহঘড়িকে গোলমাল করে দিতে পারে। ক্লান্তি ভর করবে, যখন জাগার কথা জেগে উঠলে ক্লান্ত মনে হবে। দিনে ঘুমাতেও সমস্যা হতে পারে। বিশ্রামের সময় দিনের আলোর মুখোমুখি যত কম হওয়া যায়। ঘর রাখতে হবে যতদূর সম্ভব অন্ধকার, শীতল ও শান্ত। তাতেও না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ।
ফুড এলার্জিতে ক্লান্তি
অনেকের মতে, লুকিয়ে থাকা ফুড এলার্জি ঘুম কাতর করতে পারে। আহারের পর ক্লান্তি তীব্র হলে তা ফুড এলার্জির জন্য হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম বা ফাইব্রোমায়ালজিয়া, মাম, অটল ক্লান্তির কারণ হতে পারে স্বাস্থ্য সমস্যা। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরী। মৃদু ক্লান্তি হলে, ব্যায়াম আধ ঘন্টা। সপ্তাহে তিনবার।
ম অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস বারডেম, ঢাকা
Dental Problem ! যদি দাঁত ঝকঝকে চান
সুন্দর দাঁত, সুন্দর হাসি আর এই দাঁতের কারণেই হাসতে অনেকেই বিব্রতবোধ করেন। বিশেষ করে যাদের দাঁত ঝকঝকে ও সুন্দর নয়।
কারও কারও দাঁত জন্মগত কারণেই হলদেটে হয়। যেমন যাদের গায়ের রং ফর্সা তাদের দাঁত একটু হলদেটে। যারা শ্যামলা বা কালো তাদের দাঁত সাধারণত একটু বেশি সাদা হয়। এছাড়া টেট্রাসাইক্লিন জাতীয় কিছু ওষুধ সেবনের কারণেও কারও কারও দাঁত হলদেটে হয়, এনামেলের কিছু অসুখেও হলদেটে হতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের দাঁত হলদেটে হওয়ার কারণ এগুলো নয়। তাহলে? যথাসময়ে যথাযথ পরিষ্কারের অভাব। পান, সিগারেট ইত্যাদি সেবন, দাঁত ক্যারিজ বা ক্ষয়রোগ হওয়া, সঠিক নিয়মে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ না করা। কফি-চা সেবন করার পর পরিষ্কার না করা, আয়রণযুক্ত পানি (সাধারণত টিউবওয়েলের পানি) পান এগুলোই দাঁত হলদেটে দেখানোর বড় কারণ।
করণীয় কি?
যেসব অভ্যাসের কারণে দাঁতে দাগ পড়ে যাচ্ছে তা এড়িয়ে চলতে হবে। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করতে হবে। কিন্তু আরও কিছু কাজ আছে যা নিয়মিত করলে দাগমুক্ত ঝকঝকে দাঁত হতে পারে।
ফ্লস করুন
শুধু ব্রাশ নয়, এখন ডেন্টিস্টরা খুব গুরুত্ব দেন ফ্লস করার ওপর। দেখা গেছে, ফ্লস করলে দাঁতে ক্যারিজ হয় খুব কম। ফ্লস হচ্ছে এক ধরনের সুতা, যা দিয়ে দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে আটকে থাকা খাদ্যকণা পরিষ্কার করা হয়। পেরিও ডন্টাইটিস হয়ে দাঁত নড়ে যাওয়ার ঘটনাও কম ঘটে। প্রতিবার খাবার পর ফ্লস করাটা খুব ভাল। তা যদি কোন কারণে সম্ভব না হয় অন্তত রাতের খাবারের পর ফ্লস করতে হবে। যাদের দাঁতের দাগ বেশি পড়ার প্রবণতা রয়েছে তাদের উচিত প্রতিবেলা খাবারের পর ব্রাশ করা। স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের সকালের নাস্তার পর আর রাতের খাবারের পর ব্রাশ করা দরকার। এ সঙ্গে দুপুরের খাবারের পর ব্রাশ করতে পারলে বাড়তি উপকার পাওয়া যাবে। একই কথা প্রযোজ্য ফ্লস করার ক্ষেত্রেও।
বেশি বেশি করে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি খান
সুস্থ দাঁত থাকলেই কেবল তা ঝকঝকে দেখানো সম্ভব। আর দাঁত সুস্থ ও সবল রাখতে নিয়মিত ব্যালেন্সড ডায়েট জরুরি। এই ব্যালেন্সড ডায়েটের মধ্যে থাকবে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সিযুক্ত খাবার। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সিযুক্ত খাবার। ক্যালসিয়াম ছেলে-বুড়ো সবার দাঁতই মজবুত করতে কাজ করে। ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবারের মধ্যে আছে দুধ, দুই, পনির, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, পাউরুটি ও সয়াসমৃদ্ধ খাবার। ভিটামিন সি দাঁত মজবুত করতে কাজ করে। এতে আছে এ্যান্টি অক্সিডেন্ট, যা টিসুর ক্ষতি কমায়। রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন সি নিয়মিত খেলে মাড়িতে ব্যাকটেরিয়া সহজে প্রবেশ করতে পারে না। সবুজ শাক-সবজি ও ফলমুলে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। পাশাপাশি ফল খাওয়া দাঁতের জন্য অন্যদিক থেকেও উপকারী। যেমন আপেল ও গাজর এগুলো খেলে দাঁত পরিষ্কার থাকে। ক্যারিজ কম হয়। মুখে থুতুর প্রবাহ ঠিক থাকে।
যাদের মুখে থুতু কম হলে চুইংগাম খেতে পারেন। এতে মুখে থুতুর পরিমাণ বাড়ে তবে চুইংগামের চিনিও দাঁতের ক্ষতি করে, তাই সম্ভব হলে কম চিনিযুক্ত বা চিনিমুক্ত চুইংগাম খেতে পারলে ভাল।
চা, কফি, জুস ও কোল্ড ড্রিঙ্কস থেকে সাবধান
সব ঠিকঠাক আছে তবু কারও কারও দাঁত ঝকঝকে হয় না। কারণ এই ক্ষতি হয় চিনিযুক্ত যেকোন খাবার থেকেই। তা সেটা শক্ত হোক আঠাল বা চকোলেটের মতোই। আবার টক যেকোন খাবারে একটু হলেও এসিড থাকে। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ভাল হলেও এতে থাকা এসিড দাঁতের ওপর স্তর (যা এনামেল নামে পরিচিত) ক্ষয় করে। আর এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে ক্যারিজ খুব দ্রুত হ্রাস পায়। আর চা ও কফির নিজস্ব হলদেটে ভাব তো রয়েছেই। তাই চা-কফি যারা নিয়মিত পান করেন তাদের দাঁত এ কারণে হলদেটে হয়ে যায় সহজেই।
চিকিৎসার প্রয়োজন
বাড়িতে বসে দাঁত সাদা করার টুথপেস্ট দিয়ে সাধারণত এই ধরনের দাগ পরিষ্কার হয় না। আবার কিছু কিছু টুথপেস্টে এত বেশি পরিমাণে দানাদার পদার্থ বা এ্যাবরেসিভ থাকে এগুলো দিয়ে সব সময় দাঁত ব্রাশ করলে বরং এনামেল বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তাই যাদের দাঁতে এরই মধ্যে এ ধরনের হলদেটে ভাব তৈরি হয়ে গেছে তারা তা বাড়িতে নিজেরা পরিষ্কার করার চেয়ে ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে করানো ভাল। কারণ ডেন্টিস্টের কাছে টুথপলিশ করার পেস্ট ও বিশেষ ধরনের ব্রাশ থাকে। আর তিনি জানেন এগুলো কিভাবে ব্যবহার করলে দাঁতের ক্ষতি হবে না। তাছাড়া যদি তিনি মনে করেন শুধু পশিল করলে আপনার দাঁত ঝকঝকে হবে না। প্রয়োজন হবে টুথ ব্লিচিংয়ের সেটারও ব্যবস্থা করবেন। দাঁত ব্লিচ করলে সাধারণত আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝকঝকে হয়।
ম অধ্যাপক ডা : সৈয়দ তামিজুল আহসান রতন
Subscribe to:
Posts (Atom)
